নয়াদিল্লি, ১৭ আগস্ট ২০২৫: প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (RSS)-এর প্রশংসা নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট (ISF)।
দলটির অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে পোস্ট করা একটি বিবৃতিতে মোদীকে অভিযুক্ত করা হয়েছে ইতিহাসকে বিকৃত করার এবং স্বাধীনতা সংগ্রামীদের অপমান করার জন্য। এই প্রতিক্রিয়া শুধু ISF-এর নয়, বিরোধী দলগুলির মধ্যে একটি বিস্তৃত অসন্তোষের অংশ, যারা মোদীর ভাষণকে ‘স্বাধীনতা সংগ্রামের অপমান’ বলে অভিহিত করেছে।
১৫ আগস্ট লালকেল্লা থেকে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী মোদী RSS-এর ১০০ বছরের ইতিহাসকে ‘সোনালী অধ্যায়’ বলে বর্ণনা করেন এবং এটিকে ‘ভক্তি নির্মাণ থেকে রাষ্ট্র নির্মাণ’-এর উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি সঙ্ঘকে ‘মা ভারতী’-র প্রতি আত্মনিবেদনের প্রতীক বলে উল্লেখ করেন।
কিন্তু ISF-এর বিবৃতিতে এই দাবিকে ‘সর্বৈব মিথ্যা’ বলে খারিজ করা হয়েছে। দলটি অভিযোগ করেছে যে RSS পরাধীন ভারতে ‘গদ্দারি’ করেছে, মুসোলিনির ফ্যাসিবাদী আদর্শ থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছে এবং ব্রিটিশদের সাথে সহযোগিতা করেছে, এমনকি মুচলেকা দিয়ে জেল থেকে মুক্তি পেয়েছে। “এরা ছিল দেশের দুশমন,” বলে উল্লেখ করা হয়েছে বিবৃতিতে।
ISF আরও জানিয়েছে যে মোদী, যিনি ৮ বছর বয়স থেকে RSS-এর স্বয়ংসেবক ছিলেন, সঙ্ঘের গুণগান গাইবেনই, কিন্তু এতে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের অপমান করা হয়েছে। “একটি ফ্যাসিবাদের সমর্থক, হিন্দুত্বের পৃষ্ঠপোষক, সংকীর্ণতাবাদী সংগঠনের গুণগান গেয়ে ১৫ আগস্টের ঐতিহাসিক তাৎপর্যকে কলঙ্কিত করলেন,” বলে তোপ দাগা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, ভারত সরকারের পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রণালয়ের একটি বিজ্ঞাপনে মহাত্মা গান্ধী এবং নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর পাশে বিনায়ক দামোদর সাভারকরের ছবি দেওয়া হয়েছে, যাকে ISF ‘বেমানান’ বলে নিন্দা করেছে।
সাভারকরকে হিন্দুত্বের প্রধান প্রবক্তা বলে উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে তিনি ব্রিটিশ সরকারকে মুচলেকা দিয়ে জেল থেকে বেরিয়েছিলেন। “আমাদের দেশের দুই মহান দেশপ্রেমিকের পাশে এই ব্যক্তির ছবি বড়ই বেমানান। আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি,” বলা হয়েছে।
ISF-এর বিবৃতিতে শেষ করে বলা হয়েছে: “ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে যাদের কণামাত্র অবদান নেই, তাদের উত্তরসূরি আজ ক্ষমতাসীন। এরাই দেশকে সাম্প্রদায়িকতা, ঘৃণা, বিভেদের বিষবাষ্পে ভরিয়ে দিচ্ছে। এদের বিরুদ্ধেই আমাদের লড়াই। রাস্তার লড়াই। মননের লড়াই। যুগপৎ চলবে।”
এই প্রতিক্রিয়া শুধু ISF-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিরোধী দলগুলি থেকে একই ধরনের সমালোচনা উঠে এসেছে। কংগ্রেস নেতারা মোদীর RSS-এর প্রশংসাকে ‘স্বাধীনতা সংগ্রামের অপমান’ বলে অভিহিত করেছেন এবং বলেছেন যে RSS ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে লড়াই করেনি বরং ঘৃণা ও বিভেদ ছড়িয়েছে।
কংগ্রেস এমপি মণিকম ট্যাগোর বলেছেন, “RSS-এর স্বাধীনতা সংগ্রামে কোনো অবদান নেই।” কেরালার মুখ্যমন্ত্রী পিনারায়ী বিজয়ন মোদীর ভাষণকে ‘ইতিহাসের অস্বীকার’ বলে সমালোচনা করেছেন এবং বলেছেন যে এটি স্বাধীনতা দিবসকে অপমান করেছে। তিনি অভিযোগ করেছেন যে মোদী RSS-কে ‘স্বাধীনতার পিতা’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। AIMIM নেতা আসাদুদ্দিন ওয়াইসি বলেছেন যে RSS গান্ধীকে ঘৃণা করত এবং মোদীর প্রশংসা স্বাধীনতা যোদ্ধাদের অপমান।
পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞাপন নিয়ে আরও বিতর্ক উঠেছে, যেখানে সাভারকরের ছবি গান্ধী ও নেতাজীর সাথে রাখা হয়েছে। নেটিজেনরা এটিকে সমালোচনা করেছেন এবং বলেছেন যে এটি ইতিহাসের বিকৃতি। কংগ্রেস নেতা বি কে হরিপ্রসাদ RSS-কে ‘ভারতীয় তালিবান’ বলে অভিহিত করেছেন।
মোদীর ভাষণে RSS-কে ‘বিশ্বের সবচেয়ে বড় NGO’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যা সঙ্ঘের ১০০ বছর পূর্তির প্রেক্ষিতে। কিন্তু বিরোধীরা বলছেন যে এটি স্বাধীনতা দিবসের মতো অনুষ্ঠানে অনুপযুক্ত, যা জাতীয় ঐক্যের প্রতীক।
এই বিতর্ক দেশের রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও উত্তপ্ত করেছে, যেখানে সাম্প্রদায়িকতা এবং ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা নিয়ে চলমান টানাপোড়েন। ISF-এর মতো দলগুলি এই ইস্যুতে ‘রাস্তার লড়াই এবং মননের লড়াই’ চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।










